যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের শুরু করা বাণিজ্যযুদ্ধ, দেশটির কেন্দ্রীয় ব্যাংক ফেডারেল রিজার্ভ ও অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের ওপর তার আক্রমণ এবং গ্রিনল্যান্ড ইস্যুতে মিত্র দেশগুলোকে দেয়া হুমকি, তবু বিশ্ব অর্থনীতি শক্তভাবে টিকে আছে এবং অবিশ্বাস্য স্থিতিস্থাপকতা দেখিয়েছে বলে মনে করেন বাজার পর্যবেক্ষকরা। নানা প্রতিকূলতা ও ধাক্কা সত্ত্বেও বিশ্বজুড়ে মূল্যস্ফীতি যেমন কমছে, তেমনি ইউরোপসহ অন্যান্য অঞ্চলের শেয়ারবাজারগুলো স্পর্শ করছে নতুন উচ্চতা। খবর এফটি।
তবে পরিস্থিতি এখন ভিন্ন মোড় নিয়েছে। ইরান অভিমুখে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা একটি বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতে রূপ নেয়ায় বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান ইতিবাচক ধারা বজায় থাকবে কিনা, তা এখন মূলত জ্বালানি তেলের বাজারের ওপর নির্ভর করছে। মধ্যপ্রাচ্যের ক্রমবর্ধমান সংঘাত জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত করার বড় ঝুঁকি তৈরি করেছে, যা বিশ্ব অর্থনীতিতে বড় ধরনের ধসের শঙ্কা তৈরি করছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বড় প্রশ্ন এখন এটাই। যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানের দক্ষিণ উপকূল দিয়ে বয়ে যাওয়া হরমুজ প্রণালির মধ্য দিয়ে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে পারবে কিনা। এ গুরুত্বপূর্ণ জলপথটি দীর্ঘ সময়ের জন্য বন্ধ হয়ে গেলে বিশ্ববাজারে বড় ধরনের বিপর্যয় নেমে আসতে পারে। তবে তেলের সরবরাহ সচল ও দাম নিয়ন্ত্রণে থাকলে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধিতে ক্ষতির মাত্রা হয়তো সীমিত রাখা সম্ভব হবে।
বিপরীত চিত্রটি হবে ভয়াবহ। তেল সরবরাহ ব্যাহত হয়ে দাম আকাশচুম্বী হলে প্রধান অর্থনীতিগুলোয় মূল্যস্ফীতি পুনরায় মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। ফলে কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর সুদহার কমানোর যে পরিকল্পনা রয়েছে, তা ভেস্তে যাওয়ার উপক্রম হবে ও ব্যবসায়িক মহলে বড় ধরনের অনিশ্চয়তা তৈরি হবে।
ক্যাপিটাল ইকোনমিকসের প্রধান অর্থনীতিবিদ নিল শিয়ারিংয়ের মতে, ‘পুরো পরিস্থিতির জন্য জ্বালানি তেলের বাজারই এখন প্রধান ও একমাত্র সংকটজনক পথ।’
জ্বালানি বাজারের বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ে কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের সিনিয়র ফেলো ও মার্কিন অর্থনৈতিক যুদ্ধবিষয়ক বই চোকপয়েন্টসের লেখক এডওয়ার্ড ফিশম্যান একটি বড় আশঙ্কার কথা জানিয়েছেন। সেটি হলো, ইরানের দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নৌ-রুট হরমুজ প্রণালি দিয়ে দীর্ঘ সময়ের জন্য সব ধরনের জাহাজ চলাচল বন্ধ হয়ে যাওয়া। ফিশম্যানের মতে, বিশ্বের মোট উৎপাদিত তেলের প্রতি পাঁচ ব্যারেলের মধ্যে এক ব্যারেলই এ পথ দিয়ে পরিবাহিত হয়। ফলে রুটটি বন্ধ হওয়া মানে বিশ্ববাজারে তেলের দামে এক ‘বিরাট ধাক্কা’ লাগা।
বার্কলেসের অর্থনীতিবিদরা বলছেন, যুক্তরাষ্ট্র-ইরান সংঘাতের আরেকটি পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হতে পারে মার্কিন ডলারের বিনিময় হার বা মান নাটকীয়ভাবে বেড়ে যাওয়া। যুক্তরাজ্যভিত্তিক এ বহুজাতিক ব্যাংকের অর্থনীতিবিদ থেমিস্টোক্লিস ফিওটাকিস বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত ও জ্বালানি তেলের দাম আরো বাড়ার ইঙ্গিত দিচ্ছে। ঐতিহাসিকভাবে দেখা গেছে, এ ধরনের সংকটে মার্কিন ডলারের অবস্থান আরো শক্তিশালী হয়।’
ব্যাংকটির পূর্বাভাস অনুযায়ী, বিশ্ববাজারের অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান বাড়তে পারে। প্রতি ১০ শতাংশ তেলের দাম বাড়লে অন্যান্য মুদ্রার বিপরীতে ডলারের মান প্রায় দশমিক ৫ থেকে ১ শতাংশ বাড়তে পারে।
এদিকে গত শুক্রবার মার্কিন ব্যাংকগুলোর শেয়ারে বড় ধরনের দরপতন ঘটেছে। গত এপ্রিলে ট্রাম্পের শুল্ক আরোপের পর থেকে এটি ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে ভয়াবহ ধস। মূলত প্রাইভেট ক্রেডিট বা বেসরকারি ঋণের বাজারে মন্দার আশঙ্কা এবং বড় বড় ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই-সংশ্লিষ্ট অস্থিরতার কারণেই এ দরপতন ঘটেছে।
বিশ্লেষকরা বলছেন, উপসাগরীয় অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী কোনো সংঘাত যদি বিশ্ব জ্বালানি বাজারকে অস্থিতিশীল করে তোলে, তবে তা শেয়ারবাজারের আস্থায় বড় ধরনের ফাটল ধরাবে। তেলের দাম বাড়লে যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক যদি সুদহার অপরিবর্তিত রাখে, বিনিয়োগকারীদের মধ্যে উদ্বেগ আরো তীব্র হতে পারে।
টি রো প্রাইসের প্রধান ইউরোপীয় অর্থনীতিবিদ টমাস উইলাডেক সতর্ক করে জানিয়েছেন, বর্তমান পরিস্থিতি বিশ্বজুড়ে ব্যবসায়ীদের মনোবল ভেঙে দিতে পারে, যার সরাসরি প্রভাব পড়বে বৈশ্বিক বিনিয়োগের গতিতে।
উইলাডেকের মতে, গত দুই মাসের ব্যবধানে বিশ্ব অর্থনীতিতে একসঙ্গে অনেক ধাক্কা বা ‘মাল্টিপল শক’ লাগার একটি প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন, ভেনিজুয়েলা সংকট, গ্রিনল্যান্ড ইস্যু, নতুন শুল্ক আরোপ ও এখন ইরান-যুক্তরাষ্ট্র পরিস্থিতি সবই ঘটেছে মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে। এ ধারাবাহিক অস্থিরতা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ পরিকল্পনায় বড় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।